Contact us to

বাংলাদেশের প্রথম দিকের থ্রিডি প্রিন্টার ইনস্টলেশনের গল্প কথা

যদিও থ্রিডি প্রিন্টার সারা বিশ্বের প্রযুক্তি জগতে এক বিস্ময়কর বিপ্লবের সূচনা করেছে কিন্তু আমাদের দেশে এখনও তেমন পরিচিতি লাভ করে নাই।
বাংলাদেশে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রথমদিকে থ্রিডি প্রিন্টার ইন্সটল করে তার মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া এন্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট অন্যতম।

২০১৫ সালে এই ডিপার্টমেন্টে প্রথম থ্রিডি প্রিন্টার সেটআপ করা হয় এবং এই প্রিন্টার দিয়ে বেশ কয়েকটি থ্রিডি প্রিন্টেড অবজেক্টও তৈরি করা হয়।

থ্রিডি প্রিন্টার এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জনাব মোস্তাফা জব্বার, তৎকালীন DIU এর ভিসি ডঃ মোঃ লুৎফর রহমান, ডঃ মোঃ গোলাম মওলা চৌধুরী, প্রফেসর ডঃ এস.এম. মাহবুব উল হক মজুমদার, আনোয়ার হাবিব কাজল, MCT প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডঃ কবিরুল ইসলাম, এই ডিপার্টমেন্টের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং আভা থ্রিডি (AAVA 3D) এর চেয়ারম্যান জনাব আরিফ আহমেদ।

সেই সময় আরিফ আহমেদ স্যারের থ্রিডি প্রিন্টার নিয়ে লেখা একটি পোস্টঃ

3D Printer Installation Ceremony

ছবি: থ্রিডি প্রিন্টার উদ্বোধন অনুষ্ঠান

থ্রিডি প্রিন্টার আজ আর রূপকথার গল্প নয়

২০০৩ সালে ডেফোডিল মাল্টিমিডিয়া তে চিফ থ্রি ডি এনিমেটর এবং ভি এফ এক্স ডেভেলপার হিসেবে কাজ শুরু করার পর আমি থ্রিডি এনিমেশন নিয়ে ২দিন ব্যাপী নিয়মিত ওয়ার্কশপ পরিচালনা করতাম। থ্রিডি এনিমেশনকে বাংলাদেশে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে এই সব ওয়ার্কশপ আয়ােজন করা হত। ওয়ার্কশপে থ্রিডি এনিমেশনের বিভিন্ন মজার মজার বিষয় উপস্থাপন করতাম। এসবের মধ্যে অন্যতম বিষয় ছিল থ্রিডি স্ক্যানার, মােশন ক্যাপচার ডিভাইস এবং থ্রিডি প্রিন্টার। থ্রিডি প্রিন্টার এর প্রসংগে যখন বলা হতাে যে, থ্রিডি সফটওয়ারে তৈরী কোন মডেল প্রিন্ট করা যাবে যা আমরা হাতে ধরতে পারব তখন বেশির ভাগ অংশগ্রহনকারীই ব্যাপারটি বিশ্বাস করতে পারতেন না। তারা এ বিষয়টিকে রূপকথার গল্প বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বলেই উড়িয়ে দিতেন। আমি নেট থেকে থ্রিডি প্রিন্টার এর কাজের কিছু ভিডিও ডাউনলােড করে দেখাতাম। এর মধ্যে একটি ছিল লবণদানি প্রিন্টের ভিডিও। এই ভিডিওটি দেখে অনেকে এটিকে ক্যামেরার কারসাজি বলতেন।

এক যুগ পরে ২০১৫ তে এসে এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন থ্রিডি প্রিন্টার দিয়ে বাড়ি, গাড়ি,আগ্নেয়াস্ত্র, রকেটের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে খাবার-দাবার এমনকি জীবকোষ পর্যন্ত প্রিন্ট করা যাচ্ছে।

এখন থেকে বছর তিনেক আগে আমি ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল্টিমিডিয়া এবং ক্রিয়েটিভ টেকনােলজি ডিপার্টমেন্ট এ যুক্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের থ্রিডি প্রিন্টার এর উপর এসাইনমেন্ট দিয়েছি। আজ আমাদের MCT Department এ থ্রিডি প্রিন্টার চলে এসেছে। আগামিকাল ইনস্টল হবে।

আজ এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি আগামি দিনগুলােতে থ্রিডি প্রিন্টার আমাদের জীবন যাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাবে। আগামী এক দশকেই বিশ্বকে বদলে দিবে থ্রিডি প্রিন্টার।

ছবি: থ্রিডি প্রিন্টার

ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া এন্ড ক্রিয়েটিভ টেকনােলজি (MCT) ডিপার্টমেন্টে থ্রিডি প্রিন্টার আনার পর থেকে থ্রিডি প্রিন্টিং এর বিষয়ে অনেকের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরী হয়েছে। বিশেষভাবে আমাদের MCT ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা তাে বেশ উৎসাহী। পাশাপাশি সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষারর্থীরাও থ্রিডি প্রিন্টিং বিষয়টি জানতে ইচ্ছুক। থ্রিডি এনিমেশন এর জগতে সেই ২০ বছর আগে যুক্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই বিষয়টিতে আমার আগ্রহের কোন কমতি নেই। থ্রিডি প্রিন্টার এর বিষয়ে আমার ছাত্র-ছাত্রী এবং অন্যান্যদের মত আমিও যথেষ্ট আগ্রহী।

শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অনেকেই থ্রিডি প্রিন্টিং ও প্রিন্টার এর বিভিন্ন বিষয় জানতে চায়। আমি সবাইকে Google এ 3d Printer লিখে সার্চ দিতে বলি। কারণ Google থাকতে কোন বিষয় জানা আজ আর কোন বিষয়ই নয়।

তারপরেও অনেকে কেন জানতে চায়? আমার মনে হয় Google এ তথ্যের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে সঠিক তথ্যটি বুঝতে অনেকের হয়তাে বেশ সময় লেগে যায় এবং এক সময় আগ্রহও হারিয়ে ফেলে। তাই আমি ভাবলাম থ্রিডি প্রিন্টার এর বিষয়ে তথ্য সাজিয়ে লিখে আমি শেয়ার করতে পারি। সেজন্যই এ লেখাটি। যদি লেখাটি সবার কিছু প্রশ্নের উত্তর যােগাতে পারে এবং বিষয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরী করতে পারে তাহলেই আমি ধারাবাহিক ভাবে কিছু লেখা প্রকাশ করবাে।

থ্রিডি প্রিন্টিং কি?

একটি ডিজিটাল ফাইল থেকে ত্রিমাত্রিক বস্তু তৈরীর প্রক্রিয়াই হলাে থ্রিডি প্রিন্টিং। এটি এক প্রকারের সংযােজিত উৎপাদন প্রক্রিয়া (Additive Manufacturing). আর থ্রিডি প্রিন্টার হলাে সেই যন্ত্র যার মাধ্যমে এই প্রিন্টিং করা হয়। থ্রিডি প্রিন্টারকে একপ্রকারের শিল্পী রােবট বলা যায়।

এই যন্ত্রটি স্তরের পর স্তর পদার্থ যুক্ত করতে থাকে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ বস্তুটি তৈরী হয়। থ্রিডি স্টুডিও ম্যাক্স বা মায়া অথবা অন্য যে কোন থ্রিডি মডেলিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রথমে থ্রিডি মডেল তৈরী করা হয়। এই থ্রিডি মডেলটিকে নির্দিষ্ট থ্রিডি প্রিন্টারের উপযােগী ফরমেটে রূপান্তরিত করে প্রিন্টের জন্য পাঠানাে হয়। সব থ্রিডি প্রিন্টার একই প্রক্রিয়ায় কাজ করে না। ত্রিমাত্রিক বস্তুর অনুভূমিক ক্রস সেকশনের স্তর তৈরী এবং সংযুক্তি একেক প্রিন্টার একেক ভাবে কাজ করে থাকে।

কিছু পদ্ধতি আছে যেখানে পদার্থকে গলিয়ে নরম করে স্তর সমূহ গঠন করা হয়। SLS (Selective Laser Sintering), FDM (Fused Deposition Modeling) এ সব থ্রিডি প্রিন্টিং এর সাধারণ প্রক্রিয়া। এছাড়া আছে SLA (Stereo lithography) যেখানে UV Laser এবং Photo reactive resin ব্যবহার করে একবারেই একটি স্তর গঠন করা হয়।

২০১০ সালে American Society for Testing and Material (ASTM) group ‘ASTM F42–Additive Manufacturing’ থ্রিডি প্রিন্টিং এর ৭টি বিভাগ নির্ধারণ করেছে। যেমন এগুলাে হলাে:

1. Vat Photopolymerisation
2. Material Jetting
3. Binder Jetting
4. Material Extrusion
5. Powder Bed Fusion
6. Sheet Lamination
7. Directed Energy Deposition

Material Extrusion পদ্ধতিতে যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় তা হলাে Fused Deposition Modeling (FDM). এটিই সবচেয়ে সহজ এবং সাধারন পদ্ধতি।

FDM প্রযুক্তিতে বস্তু গঠনে প্লাস্টিক এবং মেটাল ব্যবহার হয়। এগুলাে তারের মত। কয়েলে পেঁচানাে থাকে যাকে ফিলামেন্ট বলে। এই ফিলামেন্ট প্রিন্টারের এক্সট্রশন। নজলের মুখ দিয়ে গলন্ত অবস্থায় বের হয়ে স্তর গঠন করে। নজলের মুখ দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই এটি শক্ত হয়ে যায়। এই প্রযুক্তিতে দুই প্রকারের প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। একটি হলাে ABS (Acrylonitrile Butadiene Styrene) অপরটি PLA (Polylactic Acid), এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পদার্থ পাওয়া যায় যেমন কাঠ বা ফ্লেক্সিবল প্লাস্টিক ইত্যাদি। আমাদের MCT ডিপার্টমেন্টের থ্রিডি প্রিন্টারটি FDM প্রযুক্তিতে কাজ করে।

ছবি: থ্রিডি প্রিন্টেড অবজেক্ট (সংগৃহীত)

অল্প কিছুদিন হলাে আমাদের দেশে থ্রিডি প্রিন্টার পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও এখনও বিষয়টি কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে যুক্ত প্রফেশনাল এবং শিক্ষার্থীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে সস্তা এবং সহজ প্রযুক্তির থ্রিডি প্রিন্টার যার ব্যবহার আমাদের দেশে শুরু হয়েছে তা হলাে FDM প্রযুক্তির Material Extrusion Type Printer.
Stratasys নামে একটি কোম্পানী ১৯৯১ সালে FDM প্রযুক্তির থ্রিডি প্রিন্টার প্রথম তৈরী করে।

অবাক করা বিষয় হলাে ১৮৬০ সালে ক্যামেরা কৌশল ব্যবহার করে ফটোভাস্কর্য পদ্ধতি উদ্ভাবন করে প্রথম থ্রিডি প্রিন্টিং এর ধারণার সূত্রপাত করেন ফ্রানকোইস উইলিয়াম নামের একজন প্রযুক্তিবিদ।

এরপর ১৮৯২ সালে ব্লান্থার স্তর পদ্ধতি ব্যবহার করে টপােগ্রাফিক্যাল ম্যাপ তৈরী করেন। ১৯৮৪ সালে চার্লস হাল ডিজিটাল ডাটা থেকে ত্রিমাত্রিক বস্তু তৈরী করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। ১৯৮৬ সালে চার্লস এই উদ্ভাবনকে Stereo lithography নামে পেটেন্ট করেন এবং ১৯৮৮ সালে প্রথম বানিজ্যিক ভাবে থ্রিডি প্রিন্টার তৈরী করেন।এভাবেই ধাপে ধাপে প্রায় ১৫০ বছরের অধিক সময়ে বহু বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষকের নিরলস প্রচেষ্টায় আজ থ্রিডি প্রিন্টার সর্বজনের ব্যবহার উপযােগী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে থ্রিডি প্রিন্টার দিয়ে মানুষের কল্পনার প্রায় সব বস্তুই প্রিন্ট করা যায়। খাবার-দাবার থেকে শুরু, ঘরে ব্যবহারের জিনিস পত্র, ইঞ্জিন, গাড়ী বাড়ী, বিমান, রকেটের যন্ত্রাংশ, বন্দুক এমনকি মানবদেহের বিভিন্ন অংঙ্গও প্রিন্ট করা যাচ্ছে ।

Please follow and like us:
error

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)